সোমবার, ২৭শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ১২ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, শরৎকাল | ২০শে সফর, ১৪৪৩ হিজরি

“এক অনাকাঙ্খিত প্রেম”

ভাষান্তর: | বাংলা বাংলা English English हिन्दी हिन्दी ဗမာစာ ဗမာစာ

লিখেছেনঃ-ভদন্ত আশিন ধর্মপাল, মায়ানমার (বার্মা)থেকে….

একজন ভিক্ষুকে যতই দুঃশীল বলা হােক না কেন৷ তিনি অবশ্যই কাম সেবন হতে বিরত থাকবেন৷ নেশা যাতীয় গ্রহণ করা থেকেও বিরত থাকবেন এবং সাধারণ একজন গৃহীর তুলনায় অনেকাংশই নিজেকে সংযত রাখবেন৷ বিনয় পালনের বাহিরেও লােক লজ্জার কারণে অনেকটাই সংযত থাকেন। যেখানে ব্যক্তিসত্বার গাম্ভীর্যতা প্রকাশ পায়। একজন ভিক্ষুকে যতই দুঃশীল বলা হােক না কেন৷ তার অন্তরে থাকবে প্রেম আর করুণা। তিনি কখােনই একটি প্রাণীকে নির্দয়ভাবে হত্যা করবেন না। বড় ধরণের চুরিও করবেন না। এমন অনেক অনেক গুণ একজন ভিক্ষুর অন্তরে নিহিত থাকে। আর এই গুণগুলাে কেবল শ্রদ্ধার যােগ্য তা নয়। একজন ভালাে নারীর মনেও স্থান করে নিতে পারে৷

বিঃদ্রঃ-একজন নারীকে অবশ্যই পুরুষের ভিতরের ঐ গুণগুলিকে দেখার ও বিচারের শক্তি রাখতে হবে এবং নিজেও তেমনটি আচরণ করে। তবেইতাে সে “ভালাে নারী।” একজন উশৃঙ্খল নারীর কখনাে ঐ গুণ দেখার ও বিচারের ক্ষমতা থাকে না। আর যাদের এমন থাকে না, তারাই দুঃখে পতিত হয়। আজকের যুগের নারীদের এমন গুণ না থাকার কাণেই ধর্মান্তরিত হয়ে দুঃখের চিতায় জ্বালিয়ে দিচ্ছে নিজেকে।

তাই মায়ানমারের অনেকাংশ নারীদেরই যুবা ভিক্ষুদের প্রতি আকর্ষন থাকে।

তেমনি এক ভিক্ষু ছিলেন৷ দেখতে যেমন সুদর্শন, তেমনি লম্বা চওড়া। পরিযত্তির(লেখাপড়া) দিক দিয়েও অনেক এগিয়ে গেছে। প্রত্যেকদিন সকালে যে রাস্তা দিয়ে পিণ্ডচারণায় যেত সেই একই রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করতাে এক মেয়ে। মেয়েটির বয়স খুব বেশি না হলেও সে ছিল একজন এম বি বি এস পাশ করা ডাক্টার। বাবাও ছিলেন একজন বিরাট ব্যাবসায়ী।

| মেয়েটি এই ভিক্ষুটিকে আজ থেকে নয়। দেখছে প্রায় এক বছর ধরে। সবসময়ই হাঁটতে আসলে কিছু ফল। নিয়ে আসে। আর সেগুলি দেওয়ার পর হাঁটতে চলে যায়। একদিন সেই মেয়েটি ফলের সাথে পলিথিনে মােড়ানাে ছােট্ট একটা কাগজ সাবাইকে(পাত্রে) দিয়ে দিল৷

| বিহারে এসে কাগজটি খােলে দেখে “ভান্তে, আমার কোমল হৃদয়টা আপনার প্রেমের অপেক্ষায় অধীর হয়ে আছে। আপনার প্রেমটুকু দিয়ে আমায় রক্ষা করুন ভান্তে। আপনার প্রেমের বাহুডােরে জীবনটা সোঁপে দিতে চাই।…..(চিঠির সম্পূর্ণ অংশ তুলে ধরতে পারছি না)” ।

এই উপাসিকার জন্যে কতাে পুরুষ যে পাগল, তাও জানা আছে ভিক্ষুটি। তাছাড়া যেই উপাসিকা সবসময়ই পিণ্ড বা দানীয় দিয়ে পূজা করে তার কাছ থেকে এমন কিছু পাওয়াটা তার জন্যে যেন সত্যিই আশ্চর্যকর। আর জীবনের প্রথম প্রেম নিবেদন বলে কথা। সব মিলিয়ে যেন মনে এক অদ্ভুদ প্রেমের সঞ্চার হলাে। ঐদিনটির প্রতিটি মূহুর্তই যেন তার স্বপ্নে বিভাের। পরের দিন ভিক্ষুটিও ছােট্ট একটি চিরকুট দেয় মেয়েটিকে। চলতে থাকে কিছুদিন৷ ধীরে ধীরে প্রেমের ঢেউগুলি যেন পূর্ণীমার রাতের ঢেউয়ের মতাে হুঙ্কার ছাড়ছে।

| ভিক্ষুটির মন শাসনে আর টিকছে না। উপাধ্যায়কে বলে শিক্ষা ত্যাগ করে। উপাধ্যায়ের শেষ একটি উপদেশ। “বাছা, জানি না তােমার ভবিষ্যত কেমন হবে। যেখানে পা দিতে যাচ্ছ, জায়গাগুলি সব কন্টকে(কাঁটা) ভরা। তবে তােমার জন্যে এই বিহারের দরজা সবসময়ই খােলা থাকবে।”

পরের দিন পরিনয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হয় দুজনে৷ চলতে থাকে সুখের সংসার। দিন যাচ্ছে, মাস যাচ্ছে, ধীরে ধীরে বছর পার করছে। এর মধ্যে গত তিন চারেক বছরে মেয়েটিকে কতজন কতভাবে বলছে “তাের স্বামীকে শুধু এভাবে বসে বসে খাওয়াবি? তারওতাে কিছু করা উচিত৷ তুইও যে সমাজে একজন প্রতিষ্ঠিতা সেটাও মনে রাখিস….” নানান জনের নানান ধরণের মন্তব্যে মেয়েটির মানসিকেরও কেমন জানি পরিবর্তন হতে শুরু করেছে। গভীর রাতে মেয়েটির বাড়ি ফেরা, সকাল সকাল অফিসের নাম দিয়ে চলে যাওয়া। নাইট ক্লাবে রাত কাটানাে। এই নিয়ে মাঝে মধ্যে ঝগড়াও হয় দুজনের মধ্যে। ধীরে ধীরে দুজনের প্রেমের মধ্যে ফাটল ধরতে শুরু করেছে। শেষমেশ তাড়িয়ে দেয় ছেলেটিকে।

জীবনের অনেকগুলি দুঃখের মাঝে খুবই তীব্র বেদনাদায়ক দুঃখ থাকে মাত্র কয়েকটি। তার মধ্যে প্রিয়জন। হতে বিচ্ছেদ হওয়ার মতাে তীব্র ব্যাথাও একটি। যেকোন মানুষকেই দিশেহারা করে ফেলে। এমনকি মৃত্যুর পথেও ধাবিত করে। এই মূহুর্তে ছেলেটিরও তেমন অবস্থা। হঠাৎ বিহারাধ্যক্ষের বলা কথাগুলি মনে পরল “তােমার জন্য এই বিহারের দরজা সবসময়ই খােলা থাকবে।” অনেক আশা নিয়ে বিহারের দিকেই পা বাড়াল।

| বিহারের আঙিনায় বসে থাকা উপাধ্যায়কে দেখেই কান্নায় লুটিয়ে পরল৷ উপাধ্যায় আগের মতােই বলল, “বাছা, বলেছিলাম না। যেখানে পা দিচ্ছ সেটা কন্টকময়।”

ছেলেটি আবার শাসনে আসার জন্যে প্রার্থনা করলে বিহারাধ্যক্ষ তাকে পাত্র চীবর সংগ্রহ করে আসার জন্যে বলে৷ পরদিনই কাজের খোঁজে বের হয় ছেলেটি। ছােট্ট একটা কাজও পেয়ে যায়। খেয়ে দেয়ে দিনে একশ একশ করে জমাতে থাকে। এক মাস কেটে গেছে। কিন্তু জীবনের প্রথম প্রেম বিচ্ছেদ থেকে পাওয়া কষ্টগুলি তাকে এতােই ব্যথিত করেছে যেটা তার মৃত্যুর সমান৷ এই একমাসে তার সুদর্শন দেহটাও রােগার মতাে হয়ে গেছে। আজ দুই মাস পূর্ণ হলাে। সব টাকাগুলি দিয়ে অষ্ট পরিস্কার কিনে বিহারের গেল৷ বিহারের এককোণায় সেগুলি রেখে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে৷ বুকের ব্যাথাটাও যেন বেড়ে চলেছে। আর সারাদিনের অক্লান্ত পরিশ্রম। চোখও ঝিমিয়ে আসছে। আস্তে করে চোখ বন্ধ করতেই পারি দিল না ফেরার দেশে।

আহাঃ ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস৷ শেষ ইচ্ছাটাও পূরণ হল না। বিদায় নিল বুক ভরা যন্ত্রনা, অনুতাপ আর সীমাহীন কষ্ট নিয়ে। যেটার ক্ষতিপূরণ অপায়ে গিয়েই শুধরাতে হবে৷

বিহারাধ্যক্ষ এসে দেখে, সে চিরনিদ্রায় মগ্ন। তাকে আর জাগানাে যাবে না। যত শ্রান্তি ক্লান্তি ছিল আজ তা সব। শান্ত হয়ে গেছে৷ জানে না তার পরকাল কেমন হবে৷ তার কেনা অষ্টপরিস্কার দিয়েই তার সংঘদানের কাজ শেষ করে পূন্যদান করল অধ্যক্ষ

এভাবে দীর্ঘ কয়েক বছর কেটে গেছে। হঠাৎ একদিন এক অপরিচিত উপাসিকা বিহারে আসল। এসেই জিজ্ঞাস করল “অমুক ভান্তে কি বিহারে আছে?”

বিহারাধ্যক্ষ মৃদুস্বরে বললেন, ‘হ্যাঁ, আছে উপাসিকা।”

“তিনি কোথায় থাকেন?” জিজ্ঞাস করলে,

অধ্যক্ষ তাকে “এদিকে এসাে উপাসিকা। আমি দেখাচ্ছি” বলে বিহারের পশ্চিম পাশে নিয়ে গেল। ঝােপের মাঝখানে ইটের একটি ডিবি দেখিয়ে “ঐ যে উপাসিকা, ঐ ভিক্ষুটি ওখানেই ঘুমিয়ে আছে। তুমি শতবার। ডাকলেও আজ আর সে তােমার কাছে আসবে না। আজ তুমি নও, সেই তােমাকে অনেক অনেক দূরে ফেলে রেখে গেছে৷…”

আহাঃ এক অনাকাঙ্খিত প্রেম, জীবনের সব স্বপ্নগুলি কে ডুবিয়ে দিল অতল মহাসমুদ্রে

| কত ভিক্ষু, যােগী, ঋষি-সন্যাসী এভাবে তার অমূল্য জীবনকে এক নারীর কারণে বলি দিয়েছে তা গণনাতীত। শেষ কালে এসে শত অনুতাপ আর যন্ত্রনা নিয়ে অপায়ে গমন করে।।

মানুষ নিজের জীবনকে নিয়ে যতটুকু ভাবে তার অর্ধেকও সে পায় না। একটা ছােট্ট চাকরী হবে, স্ত্রী কন্যা পুত্র নিয়ে সুখের সংসার করবে৷ সে একসময় যেমনটি ভেবেছিল আজ হচ্ছে তার বিপরীত৷ স্ত্রী করবে পরকীয়া, পুত্র কণ্যা হবে অবাধ্য। মাস শেষে পাওয়া বেতনগুলি নিয়ে টানাপােড়া। শেষ বয়সে এসে জরা বার্ধক্য, হতাশ, অনুতাপ, প্রিয় বিয়ােগের আলিঙ্গন। “মানুষ ভাবে একধরণের, পায় আরেক ধরণের। তবুও হয় না তাদের সত্য জ্ঞান৷”

আজ যারা ভিক্ষুত্ব নিয়ে আছেন তারা পূর্ব জন্মের কোন না কোন এক পূণ্যের বলের কারণেই আছেন৷ চার অসংখ্যেয় কল্পকাল ধরে পূরন করা পারমীর দ্বারা যে অৰ্হত ধ্বজা তথাগত লাভ করেছেন তা সাধারণ পারমীর দ্বারা ধরে রাখা কঠিন৷ তাই ভিক্ষু মাত্রই পারমীবান সত্বা। কই সবাইতাে পারে না। ধনীর কথা বাদই দিলাম। খেটে খাওয়া মানুষওতাে পারে না এই অৰ্হত ধ্বজা নিয়ে কালাতিপাত করতে। সুতরাং কল্পান্তর ধরে প্রার্থনা করে পাওয়া এই অৰ্হত ধ্বজাকে ত্যাগ করার পূর্বে অবশ্যই চিন্তা করা উচিত।

সূত্র –সংগৃহিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *